কাঁচা হলুদ: প্রাকৃতিক গুণে ভরপুর এক অসাধারণ ভেষজ উপাদান
হলুদ
আমাদের
দৈনন্দিন জীবনের
একটি
অত্যন্ত পরিচিত
মসলা।
রান্নার স্বাদ,
রং
ও
সুগন্ধ
বাড়াতে
হলুদের
ব্যবহার বহু
প্রাচীন। তবে
শুধু
রান্নার মসলা
হিসেবেই নয়,
প্রাকৃতিক ভেষজ
উপাদান
হিসেবেও হলুদের
রয়েছে
বিশেষ
গুরুত্ব। বিশেষ
করে
কাঁচা
হলুদ
(Raw Turmeric) পুষ্টিগুণ ও
উপকারী
প্রাকৃতিক উপাদানে সমৃদ্ধ। প্রাচীনকাল থেকেই
আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ও
লোকজ
ব্যবহারে কাঁচা
হলুদের
প্রচলন
রয়েছে।
কাঁচা হলুদ কী?
কাঁচা
হলুদ
হলো
হলুদ
গাছের
মাটির
নিচে
জন্মানো কন্দ
বা
রাইজোম। এর
বৈজ্ঞানিক নাম
Curcuma longa।
দেখতে
আদার
মতো
হলেও
এর
ভেতরের
অংশ
উজ্জ্বল হলুদ
বা
কমলা
রঙের।
কাঁচা
হলুদ
শুকিয়ে
গুঁড়া
তৈরি
করা
হয়,
যা
আমরা
সাধারণত রান্নায় ব্যবহার করি।
কাঁচা হলুদের পুষ্টিগুণ
কাঁচা
হলুদে
বিভিন্ন ধরনের
প্রাকৃতিক উপাদান
রয়েছে।
এর
মধ্যে
উল্লেখযোগ্য হলো:
- কারকিউমিন
(Curcumin)
- অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
উপাদান
- প্রাকৃতিক
উদ্ভিজ্জ যৌগ
- খাদ্যআঁশ
- সামান্য পরিমাণে ভিটামিন ও খনিজ উপাদান
কারকিউমিন হলো
হলুদের
অন্যতম
গুরুত্বপূর্ণ সক্রিয়
উপাদান। এটি
হলুদের
বিশেষ
রং
ও
অনেক
জৈবিক
কার্যকারিতার জন্য
দায়ী।
কাঁচা হলুদের সম্ভাব্য উপকারিতা
১. শরীরের প্রদাহ কমাতে সহায়ক
কাঁচা হলুদের
কারকিউমিন প্রদাহবিরোধী
বৈশিষ্ট্যের জন্য
পরিচিত। বিভিন্ন
গবেষণায় দেখা
গেছে, কারকিউমিন শরীরের
প্রদাহ-সম্পর্কিত কিছু
প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত
করতে পারে। আর্থ্রাইটিস বা গেঁটেবাত ব্যথা কমায়। জয়েন্টের অস্বস্তি
কমাতে সহায়ক হয়ে থাকে। বাতের ব্যথা ও হাড়ের জোড়ের শক্তভাব কমায়।
২. অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে
শরীরে
প্রতিনিয়ত বিভিন্ন কারণে
ফ্রি
র্যাডিক্যাল তৈরি হয়। হলুদের
কারকিউমিন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে
কাজ
করতে
পারে
এবং
অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে
ভূমিকা
রাখতে
পারে।
৩. হজমে সহায়ক হতে পারে
পরিমিত
পরিমাণে হলুদ
খাবারের সঙ্গে
গ্রহণ
করলে
কিছু
মানুষের হজমে
সহায়ক
হতে
পারে।
তবে
অতিরিক্ত হলুদ
খেলে
কারও
কারও
পেটে
অস্বস্তি বা
অ্যাসিডিটি হতে
পারে।
৪. ত্বকের যত্নে ব্যবহার
ত্বকের উজ্জ্বলতা ও লাবণ্য বৃদ্ধি
করে। কাঁচা হলুদ দীর্ঘদিন ধরে
ত্বকের
পরিচর্যায় ব্যবহৃত হয়ে
আসছে।
এতে
থাকা
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও
প্রদাহবিরোধী উপাদান
ত্বকের
যত্নে
সম্ভাবনাময়। তবে
সরাসরি
ত্বকে
লাগালে
কারও
কারও
অ্যালার্জি বা
জ্বালাপোড়া হতে
পারে। ব্রণ ও ত্বকের দাগ দূর করতে সাহায্য করে। তারুণ্য ধরে রাখতে ও বার্ধক্য রোধ করতে সাহায্য করে। অ্যালার্জি ও ত্বকের চুলকানি দূর করে।
৫. রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক
হলুদের
বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদান
শরীরের
স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে
সম্পর্কিত কিছু
জৈবিক
প্রক্রিয়ায় ভূমিকা
রাখতে
পারে।
তবে
হলুদ
কোনো
রোগের
নিশ্চিত প্রতিষেধক নয়। রক্তে শর্করা বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখে। লিভারের কার্যক্ষমতা ও স্বাস্থ্য ভালো রাখে। কোষ্ঠকাঠিন্য ও পেটের গ্যাস দূর করে। কাটা-ছেড়া বা ক্ষত দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে। শরীরের অতিরিক্ত চর্বি ও ওজন কমাতে সাহায্য করে।
৬. হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য সম্ভাবনাময়
কারকিউমিন নিয়ে
হৃদ্স্বাস্থ্য ও রক্তনালির কার্যকারিতা সম্পর্কিত গবেষণা
চলছে।
তবে
হৃদ্রোগ প্রতিরোধ বা
চিকিৎসার বিকল্প
হিসেবে
হলুদ
ব্যবহার করা
উচিত
নয়। হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে দারুণ ভূমিকা রাখে।
৭.
রক্ত পরিষ্কারক
খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) এর মাত্রা কমায়। রক্ত জমাট বাঁধা রোধ করতে সাহায্য করে। রক্ত পরিষ্কার করতে প্রাকৃতিকভাবে কাজ করে। রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া দূর করতে সাহায্য করে।
8.
হলুদের আরও কিছু উপকারিতা হলো-
১. স্মৃতিশক্তি বাড়াতে এবং ডিমেনশিয়া প্রতিরোধে সাহায্য করে। মস্তিষ্কের কোষের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
২. অবসাদ ও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
৩. ফুসফুসের সংক্রমণ ও সর্দি-কাশি দূর করে। অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টের প্রকোপ কমায়।
৪. গলা ব্যথা ও টনসিলের ইনফেকশন কমায়। ক্যান্সারের কোষের বৃদ্ধি রোধ করতে সাহায্য করে।
৫. পিরিয়ডের অনিয়মিত ব্যথা ও cramps কমায়। হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
৬. চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে। শরীরের শক্তি ও এনার্জি লেভেল বাড়িয়ে দেয়।
৭. ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
৮. মুখের ঘা ও মাড়ির ইনফেকশন দূর করে। দাঁতের হলদে ভাব ও ব্যাকটেরিয়া দূর করে।
৯. শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়।
১০. সর্দি লাগলে নাক বন্ধ ভাব দূর করে। কফ ও শ্লেষ্মা দূর করতে সাহায্য করে।
১১. খুশকি দূর করে মাথার স্ক্যাল্প স্বাস্থ্যোজ্জ্বল রাখে। চুল পড়া কমিয়ে নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে।
১২. ঘুমের মান উন্নত করতে ও অনিদ্রা দূর করে।
১৩. পেটের কৃমি দূর করতে দারুণ কার্যকরী। পিত্তথলির কার্যক্ষমতা সচল রাখে।
১৪. স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত ও শক্তিশালী রাখতে সাহায্য করে।
১৫. শরীরের রোগজীবাণু ধ্বংস করতে সাহায্য করে। শরীরের মেটাবলিজম রেট বাড়িয়ে দেয়।
১৬. সাইনাসের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
১৭. সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করে।
১৮. পেটের আলসার নিরাময়ে সহায়তা করে। স্নায়ুর দুর্বলতা দূর করতে সাহায্য করে। শরীরকে ভেতর থেকে চাঙ্গা ও সতেজ রাখে।
১৯. সামগ্রিক আয়ু ও ভাইটালিটি বাড়াতে সাহায্য করে।
হরিদ্রা বা
হলুদ
খাওয়ার
নিয়ম:-
* সকালে খালি পেটে: ঈষদুষ্ণ গরম জলের সাথে সামান্য কাঁচা হলুদ বা গুঁড়ো হলুদ মিশিয়ে খেলে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায়।
* গোলমরিচের সাথে: এক চিমটি গোলমরিচের গুঁড়ো ও সামান্য খাঁটি মধু বা অলিভ অয়েলের সাথে হলুদ মিশিয়ে খেলে এর কার্যকারিতা বহুগুণ বেড়ে যায় (শরীরে সহজে শোষিত হয়)।
* দুধে মিশিয়ে (টারমারিক লাটে): রাতে ঘুমানোর আগে এক গ্লাস কুসুম গরম দুধে সামান্য হলুদ ও দারুচিনি গুঁড়ো মিশিয়ে পান করলে ঘুম ভালো হয় এবং শরীর মেরামত হয়।
* খাবারে ব্যবহার: রান্না বা সালাদের সাথে নিয়মমাফিক পরিমাণমতো হলুদ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত খাওয়া থেকে বিরত থাকা ভালো।

কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন